মোঃ নুরনবী ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় রিকসা চালকের ছেলে ফিরোজ জিপিএ-৫ পেয়েও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে। তার বাবা ফয়জার আলী রাজধানী ঢাকায় রিকশা চালিয়ে প্রতিদিন যা রোজগার করেন তা দিয়ে পরিবারের ৬ জন সদস্যের খরচ বহন করে। ভিটা-বাড়ি ছাড়া কোন সম্পদ নেই। তার উপরে ঋণের কিস্তির বোঝা। সংসারের এমন অভাব-অনটনের সাথে নিত্য লড়াই করে এসএসসি পরীক্ষায় সেরা সাফল্য ছিনিয়ে এনেছে ফিরোজ আলী।

ফিরোজ চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার নিউ পাকেরহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ হতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। এছাড়াও সে গুড মর্নিং কিন্ডার গার্ডেন হতে পিএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং নিউ পাকেরহাট উচ্চ বিদ্যালয় হতে জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে। গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া ফিরোজের ইচ্ছে ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু এতোদিন কোনমতে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া ফিরোজ তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে। ফিরোজের বাড়ি উপজেলার আঙ্গারপাড়া গ্রামের তালেব মেম্বার পাড়ায়।

তার বাবা ফয়জার আলী জানান, আমি যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি তখন আমার বাবা মারা যায়। এরপর কয়েক বছর পর সংসার চালানোর তাগিদে ঢাকায় এসে রিকসা চালাই। রিকসায় বিভিন্ন পরিবারের ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে নিয়ে আসার ফলে চিন্তা করি আমার ছেলে মেয়েদেরও ভাল করে পড়াশোনা করাব। এরপর হতে শুরু করি সন্তানদের নিয়ে সংগ্রাম। আমার ভিটেমাটি ছাড়া জমিজমা নেই। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, ২ ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আমার সংসার। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সবার বড় ফিরোজ। ছোট ছেলে মোঃ ফরমান আলী রয়েল স্টার স্কুলে ৮ম শ্রেণিতে ও মেয়ে ফারজানা আক্তার খুশি একই স্কুলের ১ম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে।

তিনি ফিরোজের ব্যাপারে বলেন, ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ায় অনেক ভালো ফিরোজ। অভাবের সংসারে ছেলের লেখাপড়ার খরচ ঠিকমত জোগাড় করতে পারেনি। তারপরেও ফিরোজ প্রতিবারে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে সবার মুখ উজ্জ্বল করেছে।

তিনি আরো জানান, রাজধানী ঢাকায় ভাড়ায় রিকসা চালিয়ে যা আয় করি তা রিকসা ভাড়া পরিশোধ করে বাকিটুকু দিয়ে ৬ সদস্যের সংসার চালাই। এরপরও সব দিন সমান আয় হয়না। ধার দেনা করে চলতে গিয়ে বাড়ে ঋণের বোঝা। সংসারের টানা-পোড়ন, দেনা শোধ আর ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে এনজিও ঠেঙ্গমারা হতে ৪০ হাজার টাকা ও আশা থেকে ১২ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। সপ্তাহে ৬০০ টাকা ও মাসে ৪২০০ করে কিস্তি দিতে হয়। এই টাকা দেয়ার পর আয়ের সামান্য অংশ থাকে। সেটা দিয়েই সংসারের ব্যয়ভার নির্বাহ করতে হয়। তিনি তার মেধাবী সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য স্বহৃদয়বান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আকুতি জানান।

গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া ফিরোজ জানায়, অভাবে বাড়িতে অনেক দিন না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে আমাকে। বাবার প্রচেষ্টা আর আমার একাগ্রতা দিয়ে পড়াশোনা করে এই সাফল্য এসেছে। ভবিষ্যতে ডাক্তার হবার ইচ্ছে প্রকাশ করে ফিরোজ জানায়, আমি নটরডেম কলেজের মত কলেজে ভর্তি হতে চাই। আমার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন আমি ডাক্তার হব। আমার স্বপ্ন পূরণের জন্য আমি ছোট বেলা থেকেই অনেক পরিশ্রম করে আসছি। আমি ডাক্তার হয়ে সমাজের, দেশের, পরিবারের মানুষের কষ্ট লাঘব করতে চাই। এতে যত বাঁধাই আসুক না কেন, লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই আমি। আর এজন্য আমি সমাজের বিত্তবানদের কাছে সাহায্য কামনা করি ”

এ বিষয়ে তার স্কুল নিউ পাকেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, ফিরোজ অত্যন্ত মেধাবী ছেলে। প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে সে। ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও পেয়েছে সে। সুযোগ পেলে চিকিৎসক হয়ে মানবতার সেবায় নিয়োজিত হতে পারবে সে। আর প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে সে এলাকার সবার মুখ উজ্জ্বল করবে।