একজনকে ত্রাণ দিচ্ছে আর সাতজন দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। ব্যাপারটা আসলেই খারাপ দেখায়। এরকম কিছু খারাপের ভিড়ে হাজারটা ভালোর উদাহরণ আছে। যা হয়তো আপনার আমার সমালোচক চোখ এড়িয়ে যায় বা যাচ্ছে।

বিদ্যানন্দ বা এক টাকায় আহারের নাম শুনেননি, এরকম মানুষ বর্তমানে খুবই কম বাংলাদেশে। আপনি কি জানেন বর্তমানে এই বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কয়েক লক্ষ মানুষের মুখে আহার তুলে দিচ্ছে।আপনি আমি প্রতিযোগিতা বুঝলেও, সুস্থ বা অসুস্থ প্রতিযোগিতা বুঝি না।

আজকে এই মহামারির দিনে আপনি লক্ষ্য করলেই দেখবেন বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি রীতিমত প্রতিযোগিতা করে টাকা দিচ্ছে বা বিভিন্ন প্রতিরোধ পদক্ষেপ নিচ্ছে। এটাই হচ্ছে সুস্থ প্রতিযোগিতা। এতে করে কয়েক লক্ষ মানুষের সাহায্য হবে। যা এই সময়ের জন্য বড্ড বেশি প্রয়োজন।

দেশ বিদেশের অনেক সেলিব্রেটি নিজ নিজ দেশ, সমাজের জন্য হাজার হাজার মিলিয়ন টাকা দান করছেন। যা শো-অফ হিসেবে আমার মতো অনেকেই প্রচার করছি মানুষকে একই কাজ করার জন্য। এতে করে আমার বা আমাদের সিকি পরিমাণ পুণ্য হয়তো হবে না। তবে আমি নিশ্চিত যেকোনো প্রান্তে কেউ উদ্বুদ্ধ হয়ে হাজার থেকে লক্ষ মানুষের উপকার করে ফেলবে।

নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর দলে যোগদান করার পর কিছু অসাধারণ মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে। তার মধ্যে বেশিরভাগই তাদের কাজ গুলোর শো-অফ করে থাকে। তেমনি অসংখ্য মানুষের কাজ কর্ম এই করোনাভাইরাসের দিনে আমাকে রীতিমত অবাক করেছে। পরিচিত একজন একটি পরিবারকে কিছু দিনের বাজার করে দিয়ে, ফেসবুকে সেই বাজারের ছবি দিয়ে বন্ধুদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলো এই কাজটি করার। আশ্চর্যজনক ভাবে মানুষ তার এই চ্যালেঞ্জে সাড়া দিলো এবং ইতোমধ্যে শুধু আমার পরিচিতদের মধ্য থেকে প্রায় শ’তিনেক পরিবার এইভাবে উপক্রিত হয়েছে। সে যদি হাজার হাজার পুণ্যের আশায় ঐ একটি পরিবারকে বাজার করে দিয়ে বসে থাকতো, তাহলে কি বাকি পরিবারগুলো উপকৃত হতো?

এখন আশা যাক যে কয়েকটি ঘটনার জন্য, মোটাদাগে সকল শো-অফকে খারাপের কাতারে ফেলে অধিক পুণ্যওয়ালা কিছু সমালোচক সমালোচনা করছেন তাদের কথায়। তার আগে আপনি কিছু শব্দের সাথে পরিচিত ও তার উদ্দেশ্য সম্পর্ক জানা থাকা দরকার। যেমন- রাজনৈতিক মানবিকতা, স্বেচ্ছাসেবী মানবিকতা, ব্যবসায়ী মানবিকতা প্রভৃতি। এই শব্দের মধ্যেই তার তার উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। প্রত্যেকের সাহায্য করার ধরণ ও উদ্দেশ্য আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় মিল আছে, মানবিকতার তরেই কাজটি সম্পাদিত হচ্ছে। নীতি, নৈতিকতার বা ধর্মের প্রশ্নে আপনার, আমার দ্বিমত থাকতে পারে।

সাহায্য করতে গিয়ে কিছু কিছু লোক, প্রতিষ্ঠান অতিরঞ্জিত করছে। মানুষকে অপমান করছে। যেটা মানবিক কাজ করতে গিয়ে অমানবিকতার সংজ্ঞায় পড়ে যাচ্ছে। সেই কাজগুলোর সমালোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু সকল প্রচারমূলক কাজকে আপনার আমার সমালোচনা করা উচিত না। এক্ষেত্রে আপনার, আমার উৎসাহিত এবং অনুৎসাহিত কাজগুলো সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে।

এই সমাজের অনেকেই দান করছেন। যা অনেকটাই গোপনে। সেইসব লোকদের দান নিশ্চয় অধিক পুণ্যের দাবিদার। তাই বলে যারা প্রকাশ্যে দান করছে তাদের কাজগুলোকে হারাম বা গোনাহের কাজ হিসেবে নির্মাণ করতে যাওয়া কতোটুকু সঠিক?

হতে পারে আপনি আপনার সামর্থ্য অনু্যায়ি একজন বা একাধিকজনকে খুবই গোপনে দান করছেন সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য বা অধিক পুণ্যের আশায়। সেই একই কাজটি অন্য কেউ করছে হয়তো প্রকাশ্যে। এক্ষেত্রে তার চিন্তা হয়তো পুণ্য হাসিলে নেই, বরং তার চিন্তা মানুষ অনুপ্রাণিত হয়ে যেন আরও হাজার লোককে বিপদে সাহায্য করে। তবে অবশ্যই এখানে মানুষ নয়, কাজের প্রচার নিশ্চিত করতে হবে। এরূপ উপায়ে প্রকাশ্য সাহায্যকে পুণ্যের কাতারে না ফেলেন, পাপের কাতারে ফেলছেন কোন বিশ্বাস ব্যবস্থার জুড়ে?

প্রকাশ্য দানের পদ্ধতিগত বিষয়ে আপনার সমালোচনা থাকতেই পারে এবং থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ, আগেই বলেছি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বিশেষে দানের উদ্দেশ্যে ভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু আপনার সমালোচনার চোখ সকল প্রকার প্রকাশ্য দানকে এক কাতারবন্দি করে ফেললে, আপনার সামগ্রিক বিষয়গত জ্ঞান সম্পর্কে যে কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারে!শেষ করতে চাই। আমাদের অপরিপূর্ণ জানা বা পরিপূর্ণ জানা বিশ্বাস থেকে অনেক যুক্তি তর্কই করা যাবে এই বিষয় নিয়ে। যদি সকল কাজ সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য হয়, তবে কখন কোন কাজ কীভাবে করলে তিনি খুশি হবেন এবং কাহাকে কোন কাজের জন্য কতো পুণ্য বা পাপ দেবেন, নিশ্চয়ই তিনিই ভাল জানেন। আপনি-আমি কেন নির্মিত বিশ্বাস ব্যবস্থা দ্বারা নির্ধারণ করে ফেলছি সেই হিসেবটা? এমনকি যেখানে প্রকাশ্য সাহায্যকারীর মাথায় পুণ্যের চেয়ে বেশি লোকের ভালো করার চিন্তা, সেখানে আপনি কোন যুক্তিতেই বা পাপ-পুণ্যের হিসেব করছেন?

তাই আসুন প্রকাশ্য সাহায্য করা কাজের পদ্ধতিগত সমালোচনা করি, তার পুরো কাজটাকে নয়। অন্যথায় এই মহামারির দিনে সরকারের পাশাপাশি বা বিকল্প অথবা প্রায় সমার্থক হিসেবে অবিরত কাজ করতে চলা বিদ্যানন্দ বা শত শত স্বেচ্ছাসেবী প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠবে না। অনুৎসাহিত কাজগুলোকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ভালো কাজগুলোকে উৎসাহিত করি। জাতির যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে ইতিবাচক মননশীল মানুষের বড্ড বেশি প্রয়োজন।

ঘরে থাকুন, পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি দেশকে কোভিড-১৯ থেকে নিরাপদ রাখতে ভূমিকা পালন করুন। আর অবশ্যই পুণ্য বা পুণ্যবিহীন গোপনীয় বা প্রকাশ্য ভালো কাজগুলো অব্যাহত রাখুন।

মো. বাদশা মিয়া: সমাজকর্মী; নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শাবিপ্রবি, সিলেট।