ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও ভর্তি হতে পারছেন না জমজ দুই বোন-এমন একটি খবর কয়েক দিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঘুরছিল। অবশেষে বাগেরহাটের সেই দুই বোনের গতি হলো। তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন সাংসদ শেখ সারহান নাসের তন্ময় ও স্থানীয় জেলা প্রশাসন। দায়িত্ব নিয়েছেন পড়াশোনার সব খরচ নির্বাহের। এতে কেটেছে দুই বোনের দুশ্চিন্তা। তারা এখন আনন্দে ভাসছেন। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সাংসদ ও জেলা প্রশাসকের। ভবিষ্যতে তারা শিক্ষক হয়ে জাতির সেবা করতে চান বলে জানিয়েছেন।

শনিবার দুপুরে বাগেরহাট শহরের হরিণখানা এলাকার দিনমজুর মো. মহিদুল হাওলাদারের জমজ দুই মেয়ে শাহিদা আক্তার সুরাইয়া ও নাদিরা ফারজানা সুমাইয়াকে ডেকে পাঠান জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াসহ পড়ালেখার সব দায়িত্ব নেয়ার কথা জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাগেরহাট পৌরসভার হরিণখানা এলাকার দিনমজুর মো. মহিদুল হাওলাদারের বসতবাড়ি। ছোট্ট কুড়েঘরে দুই জমজ মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। মানুষের বাড়িতে রাজমিস্ত্রির যোগাল দিয়ে প্রতিদিন যা উপার্জন করেন তা দিয়েই চলে তার অভাবের সংসার। মহিদুল নিরক্ষর তবে তার স্ত্রী শাহীনা বেগম অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। তাদের জমজ দুই মেয়ে শাহিদা আক্তার সুরাইয়া ও নাদিরা ফারজানা সুমাইয়া শিশুকাল থেকেই মেধাবী। স্কুলে তারা মেধা তালিকায় মধ্যমসারির ছিল। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে তারা দুই বোন শহরের আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ‘এ’ গ্রেড পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর তারা ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে সরকারি পিসি কলেজে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ ফাইভ পান।

মা শাহীনা বেগম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘অভাবের সংসারে দুই মেয়েকে অনেক কষ্টে পড়াশোনা করিয়েছি। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগ্রহ দেখালে আমার দুশ্চিন্তা যেন আরও বেড়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে যাবে সেই খরচের টাকাই তো আমার নেই। এরপর থেকে পড়ালেখার খরচ চালানো আরও দুঃসাধ্য। কোনো কোচিং ছাড়াই তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ওরা ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় আমি আনন্দে আত্মহারা হয়েছি। তবে আমার সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি, কারণ আমার তো সামর্থ্য নেই ওদের ভর্তি করে ঢাকায় রেখে পড়ানো।’

শাহীনা বলেন, ‘টাকার অভাবে আমাদের এই দুই সন্তানের পড়ালেখা হবে না এই সংবাদ জানতে পেরে বাগেরহাট সদর আসনের সংসদ সদস্য শেখ সারহান নাসের তন্ময় তার প্রতিনিধি পাঠিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। স্থানীয় সাংসদ ও বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন আমার দুই মেয়ের পড়ালেখার সব খরচ দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।’

শাহিদা আক্তার সুরাইয়া ও নাদিরা ফারজানা সুমাইয়া ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কোনো কোচিং ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিই। তাতেই আমরা কৃতকার্য হয়েছি। ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পর ভর্তি ফি ও থাকা খাওয়া নিয়ে আমরা দুই বোন দুশ্চিন্তায় পড়ি। কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তামুক্ত করেছেন।’

তারা জানান, সাংসদের প্রতিনিধি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার নাসির উদ্দীন তাদের বাড়িতে এসে খোঁজখবর নিয়েছেন। যোগাযোগের জন্য দুই বোনকে দুটি মোবাইল সেট উপহার দিয়েছেন। তারা সাংসদ, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা চেয়ারম্যানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তারা ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে চান বলে জানিয়েছেন।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বাগেরহাটের দরিদ্র দুই মেধাবী মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারছে না ফেসবুকে এই খবর দেখতে পেয়ে আমি তাদের খোঁজখবর নিই। বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও জানাই। শনিবার দুপুরে মেয়ে দুটির পরিবারকে সার্কিট হাউজে আসতে বলি। স্থানীয় সাংসদ ও আমরা ওই মেয়ে দুটির ভর্তি ফিসহ পড়ালেখার সব দায়িত্ব নিয়েছি।’

স্থানীয় সাংসদের প্রতিনিধি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার নাসির উদ্দীন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আমি খবরটি পাই। আমি তাদের বাড়িতে গিয়ে আর্থিক অবস্থার খোঁজখবর নিই। বিষয়টি সাংসদ শেখ সারহান নাসের তন্ময়কে জানালে তিনি ওই দরিদ্র মেধাবী মেয়ে দুটির পড়ালেখার সব দায়িত্ব নেবেন বলে আমাকে আশ্বাস দেন। তিনি খুব শিগগির তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহায়তা করবেন। আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী তাদের সহযোগিতা করছি।’

(ঢাকাটাইমস