মোহাম্মদ এ আরাফাত:
দেশের সুশীল সমাজের লোকজন দুর্নীতি, সুশাসন, আইনের শাসন নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু যখনই তাদের ওপরে তা প্রয়োগ হয়, তখন তারা বিরক্ত হন। গণতন্ত্র গেলো, গণতন্ত্র গেলো, আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে এমন সব কথা বলতে শুরু করেন। ব্যবসায়ী সমাজ উঠতে-বসতে নিজেদের ক্ষয়-ক্ষতির কথা বলেন, কিন্তু সুশাসনের জন্য তাদের ওপর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গেলে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু করেন।

রাজনীতিবিদরা, বিরোধীদল বা সরকারি দল হোক, যদি অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তখন তারাও তা ভালোভাবে নেন না। বিচার করে কাউকে সাজা দেয়া হলে, তখন তারও সমালোচনা শুনতে হয়। তারেক রহমানের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার বা বেগম খালেদা জিয়ার এতিমের টাকা আত্মসাতের বিচার যখন হয় তখনও একই কথা বলতে শোনা যায়।

সরকারি দলের ভেতরেও যখন শুদ্ধি অভিযান চলছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে সরকার। কিছু মানুষ বলছেন, কেবল ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে কী হবে? কিংবা, একজন-দুজনকে ধরে কী হবে? বড় বড় দুর্নীতিবাজদের ধরা হয় না কেন? এমন সমালোচনা চলছে, চলতে থাকবেই। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা সবাই যদি আইন ভাঙি, সবাই যদি দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকি, সবাই যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমালোচনা করি আর আইন প্রয়োগ করতে গেলে যদি তা সমর্থন না করে বিভিন্নভাবে সমালোচনা করি- তাহলে তো মুশকিল।

আমাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত দ্বিচারিতা আছে। সুশীল সমাজ হোক, রাজনীতিবিদ হোক, প্রশাসনের লোক হোক, ব্যবসায়ী সমাজ হোক কিংবা এনজিও কর্মী। আমি আইনের শাসন চাই, তবে অন্যের ক্ষেত্রে, নিজের ক্ষেত্রে হলে চাই না। আমরা ওপরে কোনো আইনের শাসন প্রয়োগ করা যাবে না। অন্যে অন্যায় করলে বিচার চাই, কিন্তু আমি বা আমার কেউ করলে ঝাঁপিয়ে পড়ি, যাতে বিচারে তার শাস্তি না হয়।

প্রতিটি সরকারের ব্যবস্থাপনার একটা সক্ষমতা থাকে। মনে রাখতে হবে, তা কিন্তু অসীম নয়। এই সরকার দশ-এগারো বছর ধরে ক্ষমতায় আছে, তারা কিন্তু সব কাজ প্রথম দিন থেকে শুরু করতে পারেনি। ধাপে ধাপে এগিয়েছে। সবকিছুই ধাপে ধাপে করতে হয়। সাফল্যে স্থায়িত্ব আসে তবেই।

সরকারের চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রতিক্রিয়াকে আমি সমর্থন করি না। আমার মতে, এসব ঠুনকো প্রতিক্রিয়া। চটকদার কিছু কথাবার্তা শুনে মানুষ অস্থির হয়ে পড়ে। ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে গিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে সফলতার সঙ্গে। তার সব তো গণমাধ্যমে আসে না। সরকারের অনেক ইতিবাচক দিক গণমাধ্যমে প্রকাশিতও হয় না। আমরা মেতে থাকি সমালোচনা নিয়ে। সস্তা জনপ্রিয়তা চাই। একলাখ উন্নয়ন কাজে ২ শতাংশ দুর্নীতি হলে মানুষ এটাকে বাকী ৯৮ শতাংশতেও দুর্নীতি হচ্ছে বলে মনে করে। আশ্চর্য হলেও, বিষয়টি সত্য।

শেখ হাসিনার দর্শনটা বুঝতে হবে আমাদের। তার দর্শন একটা ঘটনাকেন্দ্রিক দর্শন নয়। তিনি দেশকে একটা পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তার সব কাজ হয়তো আমরা খালি চোখে বুঝবো না। এদেশে বিভিন্ন রকমের সমস্যা ছিলো। সুশাসনের অভাব, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, অনিয়ম-দুর্নীতি, আইনের শাসনের অভাব। সেখান থেকে শেখ হাসিনা একটু একটু করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন স্থায়ী সাফল্যের পথে। যে সফলতার নৈতিকতার ভিত্তিটা অনেক সুদৃঢ় আর বিস্তৃত।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।