এম রহমান কলামিস্ট:

সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল সুর জনগণের ক্ষমতা নির্ভর একটি ক্ষমতা কাঠামো, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ মতে -“প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে” মূলত জনগণ নির্বাচনে ভোট প্রদানের মাধ্যমে এই ক্ষমতার হস্তান্তর করে জনপ্রতিনিধিদের হাতে। জন প্রতিনিধি গণ সংসদের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের তিনটি মূল বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন করে থাকে,- সংসদ, নির্বাহী বিভাগ,এবং বিচার বিভাগ।

এই সংসদই নির্বাহী প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, সংসদের স্পিকার এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি  নির্বাচন করে। মূলত,মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাঁর উপর সংসদ কর্তৃক অর্পিত ক্ষমতাবলে বিচার বিভাগ সহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ করেন। এখানে স্পষ্ট যে, মূল ক্ষমতার সূত্র কিন্তু একটাই, সংসদ বা জন প্রতিনিধিগণ।

একজন ভোটার যখন ভোট প্রদান করেন, তখন তিনি তৎপরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য সংসদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার আইন-কানুন, বাজেট, পরিকল্পনা প্রণয়ন সহ সকল ক্ষমতা অর্পণ করেন।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা আয় ধরে  বাজেট প্রনয়ণ করা হয়েছে। ধরা যাক,আগামী পাঁচ বছরে একই ভাবে মোট ২৪০০ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হবে। এই ২৪  লক্ষ কোটি টাকা এ দেশের মানুষের পকেট থেকেই সরকার তুলবে৷ এই ট্যাক্স নির্ধারণ, সংগ্রহ এবং তার ব্যয় করার যে ক্ষমতা তা জনগণ এই ভোটের মাধ্যমে প্রদান করে। এ  দেশের একজন ভিক্ষুকও সাবান ক্রয় করে ভ্যাট দেয়৷ ভোটার আছে ১০ কোটি, মাথাপিছু প্রতি ভোটার এর পকেট থেকে প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা, বছরে ৪৮ হাজার। অর্থ্যাৎ, পাঁচ বছরে মোট- ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা বছরে সংগ্রহ করা হবে।

জনগণের পকেট থেকে এই বিশাল অংকের টাকা সংগ্রহ করা হয়,এই টাকা সংগ্রহ ও তার ব্যয়ের ক্ষমতা অর্পন এর আয়োজনে সেই সাধারণ ভোটারের ভোটাধিকার কে সম্মান করা, তাদের প্রতি প্রতিশ্রুত দলীয়  প্যাকেজ ( ইশতেহার) কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা একটি রাজনৈতিক দলের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সরকার যাদের টাকায় সরকার চলবে; নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাদের নিকট থেকে এই ক্ষমতা নেয়া হয়েছে; যাদের জন্য সরকার  পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে,তারাই মূল ক্ষমতার উৎস।

রাজনীতি মানে, এই বাজেট মূলত। হয়তো,বাজেটের নিয়ন্ত্রণই এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল প্রলোভন।  রাজনৈতিক দল গুলো ইশতেহারে নির্বাচনের পূর্বে ঘোষণা করে, প্রশাসনিক কাঠামো কেমন হবে, নীতি আদর্শ, প্রাইওরিটি এরিয়া,সংস্কার, উন্নয়ন, কর্ম-পরিকল্পনা। এক কথায় প্রজেক্ট প্রোপজাল( ইশতাহার) জনগণের উদ্দেশ্যে প্রচার করে, যে প্রতিশ্রুতি গুলো ও প্রপোজাল গুলো জনসমর্থন পাবে, তারায় সরকারে আসবে এবং দেশ প্রতিশ্রুত পন্থায় পরিচালনা করবে।

কিন্তু, এই ইশতেহার এ বর্ণিত প্রতিশ্রুতি যদি সরকার বাস্তবায়ন করতে না পারে,তার জন্য আদালত এটা নিশ্চিত করতে পারে না। কেউ আদালতে গিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না,কেননা, এগুলো, দলের মিশন ও ভিশন। এগুলো আইনী উপায়ে বলবৎ যোগ্য নয়। তাইতো, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, তা দেখভাল করার জন্যই জনগন কে নির্ভর করতে হয়, বিরোধী দল, মিডিয়া, বা সংসদীয় কমিটির উপর৷ কিন্তু,এই জবাবদিহিতার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে  সংসদ সদস্যগণই জনগনের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তাদের কর্মের জবাব, একমাত্র পরবর্তি নির্বাচন ব্যতীত দেয়ার সুযোগ থাকেনা। এ কারণে, জনগনের নিকট দায়-দায়িত্ব তাদের উপর বর্তায়।

কিন্তু, সরকার গঠনের মাধ্যমে,যেহেতু সরকার দলীয় সংসদ সদস্যগণ হতে নির্বাহী বিভাগের অধীন  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়, সেহেতু ঐ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীগণ তখন সরকার বা রাষ্ট্রের অংশ হয়ে যায়, তখন ক্ষমতা কাঠামোতে তিনটি স্তর সৃষ্টি হয়ঃ জনগণ রাষ্ট্র এবং মাঝখানে থাকে বিচার বিভাগ।

এ ক্ষেত্রে, পাঁচ বছরের শাসনকালে সব কিছু প্রতিশ্রুতি ও জনগণের চাহিদা মোতাবেক হচ্ছে কিনা, তা দেখার জন্য থাকে অন্যান্য সংসদ সদস্য। বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে মন্ত্রণালয় গুলোর কার্যক্রম কে সংসদের নিকট জবাব দিহি রাখা হয়। কিন্তু, সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদের কারণে, সরকার দলীয় সংসদ সদস্যগণ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেনা।

৭০ নং অনুচ্ছেদে আছে-

“ কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরুপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।]

কিন্তু, জনগণ তার প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে, তার হাতে একমাত্র উপায় থাকে, বিরোধী দল। একমাত্র বিরোধী দলই সরাসরি জনগণের পক্ষে সরকারের কার্যক্রম,মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম কে জবাবদিহিতার মধ্যে আনার ক্ষেত্রে অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এখানে উল্লেখ্য যে, বিরাধীদলের ব্যাপারে আমরা খুব বেশি মাথা ঘামায় না,ভাবি তারা সরকারের বাইরে মানে, তারা ক্ষমতাহীন। আমাদের মনে রাখা উচিত, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যগণ কিন্তু তাদের নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের মেজোরিটি মানুষের জনসমর্থন নিয়ে সংসদে এসেছে। সরকার দলীয় সংসদ সদস্য এবং বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে ক্ষমতা ও জনসমর্থন এর কোন তফাৎ নেই। বরং সরকার কে সমালোচনা করা, জনগণের নিকট নিজেদের দলীয় ইমেজ পুনোরোদ্ধার এর জন্য জন স্বার্থসংরক্ষণে তারাই মূখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার সামর্থ্য ও সাহস রাখে।

সংবিধান সংশোধনসহ জনগুরুত্বপূর্ণ  আইনপ্রনয়ণকালে, বিরোধীদলই একমাত্র জণস্বার্থ,মানুষের চাওয়া,  উদবিগ্নতা, জনগণের প্রত্যাশা, এবং সাধারণের পক্ষে সংসদে কথা বলতে পারে।

সরকার দলীয় অবস্থান ও সিদ্ধান্ত মূলত নির্ধারণ করেন সরকার দলীয় প্রধান। যেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় প্রধানই সাধারণত সরকার প্রধান হন, সেহেতু সরকার দলীয় প্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ও অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করার বা দলীয় প্রধান কে প্রশ্ন করার আইনগত অধিকার হারায় ঐ ৭০ নং অনুচ্ছেদের কারণে। তাছাড়া, সংবিধানে মন্ত্রিপরিষদে কে থাকবে, বা থাকবে না, সেটাও সংবিধান প্রধান মন্ত্রীর একক হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

সংবিধানের  ৫৫ (১) অনুচ্ছেদে রয়েছে- “প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি মন্ত্রিসভা থাকিবে এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে সময়ে তিনি যেরূপ স্থির করিবেন, সেইরূপ অন্যান্য মন্ত্রী লইয়া এই মন্ত্রিসভা গঠিত হইবে। (২) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাঁহার কর্তত্বে এই সংবিধান-অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে।”

কার্যত, সরকারের বা মন্ত্রীপরিষদের ক্ষমতাপ্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার অধীন হয়ে  তার মানে দাড়াচ্ছে, সরকার মানে, প্রধানমন্ত্রী এবং তার অধীনে নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীগণের চাওয়া কে সমালোচনা করার একমাত্র জায়গা বিরোধী রাজনৈতিক দল।

সংসদীয় কমিটির কাছে মন্ত্রী পরিষদের দায় ও জবাবদিহিতার বিধান থাকলেও, মূলত, সরকার দলীয় সংসদ সদস্যগণ কমিটির প্রধান থাকেন, তাই সাধারণত দলীয় মন্ত্রীদের কার্যক্রমের ত্রুটি ও ভুল-ভ্রান্তি স্বভাবতই তাদের প্রতিবেদনে খুব বেশি উঠে আসেনা।

অন্যদিকে সংবিধানের ৪৮(১) নং অনুচ্ছেদে বলা আছে-”বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন”। কার্যত, দলীয় প্রধান হিসেবে,  প্রধানমন্ত্রীর চাওয়া মতেই সাধারণত রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হয়।, আবার, রাষ্ট্রপতির ইম্পিচমেণ্টের ক্ষমতা যেহেতু সংসদের, সেহেতু মহামান্য রাষ্ট্রপতিও দলীয় অবস্থান, নিজের পদের নিরাপত্তা এবং সংসদের নিকট দায় এর কারণে সরকার দলীয় প্রধান( প্রধানমন্ত্রী) এর ইচ্ছের বাইরে যেতে চান না।

প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় প্রধান যখন একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চা করেন, তখন তার অধীনে সরকার দলীয় সকলের কৃত-কর্মের দায়-দায়িত্বও তাঁর কাধে বেশি বর্তায়। দু-চার জন মন্ত্রীর কর্মকান্ডের দায় পুরো দলকে বহন করতে হয়।

যেমনঃ প্রশ্ন ফাস,শেয়ার বাজার মন্দা, নিরাপদ সড়ক, দ্রব্য মূল্য এবং বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড প্রভৃতি বিষয়গুলোর  কোন টিই দলীয় প্রধানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন ইস্যূ নয়,তবুও, আওয়ামীলীগ কে দলীয় ভাবে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী বা সরকার দলীয় প্রধানের দলের অন্যান্য সদস্যদের জবাবদিহিতা ও নজর রাখার ভার কিছুটা বিরোধীদল বা ছায়া সরকারের কাধে দিলে জনগনের পক্ষে সরকারের কর্মকান্ডের প্রকৃত চিত্র জনগনের উদ্দেশ্যে সংসদে বিরোধী দল তুলে ধরতে পারে, এছাড়া, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সচ্চতা ও জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সরকার পরিচালনা করতে আগ্রহী, সেটি অনেকাংশে নিশ্চিত হয়, যদি সত্যিকারের কার্যকর বিরোধীদল সংসদে ছায়া সরকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।

ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াতে অপোজিশন লিডার কে শ্যাডো কেবিনেট গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয়, ছায়া মন্ত্রী পদের ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের মূল কাজ হলো, সরকারি দলের নীতিপ্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তদারকি করা এবং সরকারকে তাদের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা। এমন কি কেবিনেট এর মন্ত্রীগণ সংসদে প্রায় সমর্যাদার আসন অলংকৃত করেন।

গতবছর ডিসেম্বর এ ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এর প্রধানমন্ত্রীত্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল ব্রেক্সিটে তার অবস্থানের দরুণ। সেখানে সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের আস্থা ভোট এ তাকে টিকে থাকতে হয়েছে। গণতান্ত্রিক চর্চা এতটা কার্যকর যে, প্রধানমন্ত্রী কে নিজ দলের আস্থা ভোটের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।

পরিশেষে, এটা বলা চলে, সুষ্ঠু গনতান্ত্রিক চর্চা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফলপ্রসু করতে;; সত্যিকারের ভোটাধিকারের প্রায়োগিক দিক কার্যকর করতে; এবং জনগণের প্রদেয় ট্যাক্সের টাকার সদ্বব্যবহার নিশ্চিত করতে, শক্তিশালী বিরোধী দলের কোন বিকল্প নেই।  এ জন্য, বলা হয়-

Absolute Power corrupts absolutel. বিরোধী দল বিহীন, বা নামসর্বস্ব বিরোধি দল বা স্ট্রাটেজিক বিরোধীদল সরকারের উপর প্রভাব বিস্তারের বদলে সরকারের ইচ্ছে বাস্তবায়নের একটা হাতিয়ারে পরিণত হয়। জনগণের দায় থেকে যদি বিরোধীদল ভূমিকা না রেখে শুধু ক্ষমতার ভাগে অংশ নেয়ার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়; সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে সহায়ক নয় এবং ক্ষমতার পালা বদলের হাওয়া পরিবর্তন এর সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির জন্য খুব বেশি কার্যকর নয়।  এ জন্য, জনগণের স্বার্থ-রক্ষার রক্ষাকবচ হিসেবে একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই জনগনের মূল প্রতিনিধি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরী করা ক্ষমতা কাঠামোতে সংশ্লিষ্ট সকলের গুরুত্বপূর্ন দায় ও দায়িত্ব।