আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণার পরই নড়েচড়ে বসেছে বিএনপির তৃণমূল। দীর্ঘদিন সরকারের কঠোর অবস্থানে কোণঠাসা দলটির নেতাকর্মীরা খোলস ছেড়ে বের হচ্ছেন। যার নজির মিলেছে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সময়।

ঠুনকো ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। দীর্ঘক্ষণ ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার পরেও মাঠের দখল ছাড়েনি। এখন চলছে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার। এই সাক্ষাৎকার ঘিরেও দলীয় কার্যালয়ে দিনভর থাকছে নেতাকর্মীদের স্রোত। রাতেও সমান সরব। কার্যালয়ে আসায় অলিখিত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কেউ তা কেয়ার করছেন না। যেন নির্বাচনে ঘিরে উজ্জীবিত বিএনপি।

ধানের শীষের কাণ্ডারি কারা হচ্ছেন, সেটা নিশ্চিত না হলেও মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অন্তত ৫টি বার্তা দিচ্ছে বিএনপির হাই-কমান্ড। এর মধ্যে সবচেয়ে জোরালো বার্তা দেয়া হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকা এবং বিদ্রোহী হলে ব্যবস্থার বিষয়ে। সাক্ষাৎকার দিতে আসা নেতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে লিখিত অঙ্গিকারও নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাক্ষাৎকার দিতে আসা বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী অন্তত ১০ নেতা পরিবর্তন ডটকমকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

১. ফাঁকা মাঠে গোল নয়

বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা জানান, এবার কেন্দ্র থেকে স্পষ্ট বার্তা— সরকারি দলকে ফাঁকা মাঠে খেলতে দেয়া যাবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন হবে না। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকতে হবে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মনোনয়ন বোর্ডে যুক্ত হয়ে প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন। দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন।

সাক্ষাৎকার শেষে সাবেক ছাত্রনেতা আজিজুল বারী হেলাল পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে গেছি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার আন্দোলন হিসেবে। হাই-কমান্ড থেকে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগকে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেয়া যাবে না। যে কোনো মূল্যে নির্বাচনের মাঠে থাকতে হবে।’

২. ভোট কেন্দ্র পাহারা

বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলছেন, এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সারা দেশে আলোড়ন ফেলেছে। জনমত ধানের শীষের পক্ষে। সুতরাং ভোটের দিন হাল ছাড়া যাবে না। যে কোনো মূল্যে ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। ভোটের দিন যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যও প্রস্তুতি রাখতে হবে।

এ বিষয়ে খুলনা-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক ছাত্রনেতা রকিবুল ইসলাম বকুল পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘একতরফা নির্বাচন এদেশে আর নয়। আমাদের ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। প্রত্যেক এলাকায় দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। পরিস্থিতি মোকাবেলার আগাম প্রস্তুতি রাখতে বলেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।’

৩. ধানের শীষ যার হাতে, পক্ষ তারই

আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছে বিএনপি। সাক্ষাৎকারে মনোনয়ন বোর্ড কাউকেই শতভাগ নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। তবে যাকেই দল মনোনীত করবে, তার পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে কাজ করার নির্দেশনা দিচ্ছে। হোক তিনি বিএনপি কিংবা জোটের প্রার্থী, সবাই তাকে জয়ী করার জন্য কাজ করতে হবে।

সাক্ষাৎকার শেষে দিনাজপুর-১ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী মামুনুর রশীদ চৌধুরী পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘সাক্ষাৎকারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান কথা বলেছেন। দলের সিনিয়র নেতারা প্রশ্ন করে বিভিন্ন বিষয় জানতে চেয়েছেন। কেন আপনাকে মনোনয়ন দেয়া হবে? মনোনয়ন পেলে কি করবেন? না দিলে অবস্থান কি হবে? জয়ী হতে পারবেন কি না? দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে, তার পক্ষে কাজ করবেন কি না ইত্যাদি।’

তিনি বলেন, ‘সাধ্যমতো প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। বলেছি, আমি এখন রানিং উপজেলা চেয়ারম্যান। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমি নির্বাচিত হয়েছি, এলাকার জনগণ আমার সঙ্গে আছেন। দল বিবেচনা করলে অবশ্যই নির্বাচিত হব বলে আশা রাখি। তবে মনোনয়ন না দিলেও দুঃখ নেই। দল যাকে দেবে, তার হয়ে কাজ করতে প্রস্তুত আছি।’

৪. বিদ্রোহী হলে কঠোর ব্যবস্থা

মনোনয়ন বোর্ডের সাক্ষাৎকারে প্রার্থিতা নিয়ে বিদ্রোহের বিষয়ে কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছে বিএনপি। দল বা জোট যাকে যেখানে মনোনয়ন দেবে, তার হয়ে অন্যদের কাজ করতে হবে। বিদ্রোহী হলে দল থেকে সারা জীবনের জন্য বহিষ্কারও হতে হবে বলে জানানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে পঞ্চগড়-২ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদ পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘এই আসনে আমরা চারজন মনোনয়ন ফরম তুলেছি। দলের বাইরে কাউকে প্রার্থী না দিতে অনুরোধ করেছি। তবে দল যে সিদ্ধান্ত দেবে মেনে নেব।’

৫. বলা মাত্র মনোনয়ন প্রত্যাহার

ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন প্রত্যাশীদের দলীয় প্যাডে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলম স্বাক্ষরিত প্রত্যয়ন দেয়া হচ্ছে। মনোনয়ন বোর্ডের সাক্ষাৎকারেই এটি দেয়া হচ্ছে, যাতে নির্বাচন কমিশন থেকে তারা মনোয়ন ফরম তুলতে ও জমা দিতে পারেন।

পাশাপাশি লিখিত অঙ্গিকার নেয়া হচ্ছে, দল বলা মাত্র মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে হবে।

জানা গেছে, সব বিভাগের সাক্ষাৎকার শেষ হলে আগামী ৮ ডিসেম্বর প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করবে বিএনপি।

গত ১২ নভেম্বর থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমা নেয় বিএনপি। পাঁচ দিনে দলটির চার হাজারের বেশি নেতা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। তফসিল অনুসারে, আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট হবে।

সূত্র: পরিবর্তন।