পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ পাওয়া হয়তো দুষ্কর হবে যে ঘুরতে পছন্দ করে না। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত, ম্যানগ্রোভ বন ও হাওড়ের দেশ বাংলাদেশে দেশি পর্যটকদের পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত অনেক পর্যটকের আগমন ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশে এসে মাঝে মাঝে বিদেশী পর্যটকগণ বিভিন্ন তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। ফলে বহিঃবিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয় এবং পর্যটনশিল্পে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হয় না ।

পর্যটক আকৃষ্ট করার মতো বাংলাদেশে রয়েছে অসংখ্য পর্যটন স্পট। যেমন – পৃথিবীর দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত ; যা কক্সবাজার শহর থেকে বন্দরমোকাম পর্যন্ত একটানা ১২০ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। এছাড়াও রয়েছে দক্ষিণ – পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা কুয়াকাটায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়।

বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো সেন্টমার্টিন দ্বীপ। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের শহর টেকনাফ হতে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে ও মায়ানমার উপকূল হতে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এটি । এর পাশেই রয়েছে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের স্থান ছেঁড়া দ্বীপ, যা কেয়াবনের সাথে সমুদ্রের নীলপানির অপরূপ সমন্বয়ে এক নৈসর্গিক দৃশ্য পরিবেশন করে আসছে সূদীর্ঘকাল থেকে।

এছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রসমূহে প্রতিনিয়ত মানুষের পদচারণায় হচ্ছে মুখরিত। প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানুষের ঢল এবং আয় হচ্ছে প্রচুর দেশী-বিদেশী মুদ্রা। এসব পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের সমাগম এবং আগ্রহ দেখে নি:সন্দেহে বলা যায়, পর্যটনকেন্দ্রসমূহে যাতায়াত সুবিধা এবং আবাসন সুবিধা অনেকাংশেই ভালো। কিন্তু আমরা এ কথা হলফ করে বলতে পারি না যে, পর্যটন কেন্দ্রসমূহে কোন ধরণের সমস্যা নেই। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প দিনে দিনে পূর্বের তুলনায় ভালো হলেও নানা ধরণের সমস্যায় জর্জরিত। ফলে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল পাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না এবং সে কারণে বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারছে না।

বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে বিদ্যমান সমস্যাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো –

♦ পর্যটন এলাকাগুলোতে জনসাধারণের নিরাপত্তার ব্যাপক অভাব রয়েছে। ফলে, চুরি, ডাকাতি এবং ছিনতাই এর মত জঘন্য ঘটনা প্রায়শই ঘটে থাকে।
♦ পর্যটক হিসেবে বিদেশিরা আসলে তাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলার মত তেমন দক্ষ কাউকে পাওয়া যায় না। ফলে তাদের কাছে প্রকৃত তথ্য এবং সৌন্দর্য তুলে ধরতে আমরা ব্যর্থ হই।
♦ যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত না হওয়ার কারণে ভ্রমণ অনেকসময় আনন্দের পরিবর্তে বিষাদে পরিণত হয়।
♦ পর্যটনশিল্পে বিরূপ প্রভাবের অন্যতম কারণ হলো সড়ক দূর্ঘটনা ক্রমাগত সড়ক দূর্ঘটনার কারণে দেশি – বিদেশি পর্যটকরা মাঝে মাঝে ভ্রমণের উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।
♦ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভিক্ষুকদের উৎপাত, চাহিদামত সেবা না পাওয়া, পর্যটকদের সাথে প্রতারণা এবং নিম্নমানের পণ্যসামগ্রী দিয়ে অধিক মূল্য গ্রহণ ইত্যাদির কারণেও পর্যটনশিল্প প্রকৃত আশার আলো দেখতে পারতেছে না।

উপরোক্ত বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভিসা জটিলতার কারণে অনেক বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসতে চায় না। উপরন্তু বিমানবন্দরগুলোতে অনেকসময় বিদেশিরা হয়রানির শিকার হন ; ফলে তারা ইচ্ছা সত্ত্বেও ক্ষোভে এ দেশে আসেন না কিংবা পরিচিত কাউকে এদেশে আসতে উৎসাহিত করেন না। এসব সমস্যার সমাধানকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আশা করা যায় বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প আশার আলো দেখবে ।

পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থা ( ইউএনডাব্লিউটিও) এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোট পর্যটক আগমন ঘটে ১৩২৩ মিলিয়ন। ২০১৬ সালে যেখানে পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১২৩৭ মিলিয়ন। ২০১৬ সালে পর্যটক সংখ্যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৬.৬% বেশি ছিল। অপরদিকে, ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটক গমন বেড়েছে ৭ শতাংশ, যা ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। সবচেয়ে বেশি পর্যটক আগমন বেড়েছে আফ্রিকায় ৮ শতাংশ এবং ইউরোপে ৯ শতাংশ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশে বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬১৭ জন। সেখানে ২০১৪ সালে পর্যটকের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৩৪ জনে। এদিকে বাংলাদেশের ট্যুর অপারেটররাও দাবি করছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১৩ সাল থেকে দেশে ক্রমাগত বিদেশি পর্যটক কম আসছেন।

বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও পর্যটকবান্ধব পর্যটন গড়ে তুলতে দরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত উদ্যোগসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে –
♦ পর্যটকদের প্রয়োজনীয় মালামালের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।
♦ উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপদ যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে।
♦ আমাদের মূল পর্যটন ভেন্যূ যদি কক্সবাজার হয়, সেখানে একটি ডলফিন সার্কাস বসাতে পারি ; পারি গ্লাস সজ্জিত বিশাল একটি মৎস্যপার্ক স্থাপন করতে। যেখানে বিশ্বের সুন্দর, বৃহৎ ও বিরল প্রজাতির বিভিন্ন মাছ স্থান পাবে।
♦ বিদেশি নাগরিক ও ট্যুরিস্টদের গাড়ি হরতাল-অবরোধের আওতামুক্ত রাখতে হবে।
♦ পর্যটন এলাকাগুলো নিরিবিলি করে তার নিকটবর্তী শহরেও সমস্ত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
♦ সরকারি – বেসরকারি বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে পর্যটনস্পটগুলো নিয়ে জোর প্রচারণা চালাতে হবে।
♦ পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি মার্কেটগুলোতে স্বল্পমূল্যে উন্নত মানের আকর্ষণীয় পণ্য সরবরাহ করতে হবে।
♦ বিভিন্ন দেশ, জাতি ও ধর্ম অনুযায়ী তাদের জন্য পোশাক, পরিবেশ ও অন্যান্য পর্যাপ্ত সুযোগ – সুবিধা দিতে হবে।
উপরোক্ত পদক্ষেপসমূহ যদি যথোপযুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে পর্যটনকেন্দ্রসমূহ ভরে উঠবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পরচারণায়।

পর্যটকদের আন্তরিক সহযোগিতা এবং কর্তৃপক্ষের দক্ষ তত্ত্বাবধানে পর্যটনকেন্দ্রগুলো হয়ে উঠুক পর্যটকবান্ধব ; পর্যটনশিল্প লাভ করুক উত্তরোত্তর সাফল্য। ফা- হিয়েন, হিউয়েন সাঙ ও ইবনে বতুতার মতো সারা বিশ্বের লাখোলাখো পর্যটকের আগমন ঘটুক এই বাংলায় ।

লেখক:

আবু সুফিয়ান
শিক্ষার্থী,
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।