মোঃ নুরনবী ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক

মানুষের জীবনে চলার পথে আসে নানা ধরনের বাধা। কিন্তু তাই বলে কি জীবন থেমে থাকে? অনেকেই আছেন যারা সব বাধা মোকাবেলা করে এগিয়ে যান সামনের দিকে। অর্জন করেন সফলতা। হয়ে উঠেন একজন সংগ্রামী জয়িতা।

নিজের অদম্য মনোবল সম্বল করে চরম প্রতিকূলতাকে জয় করে জয়িতারা তৃণমূল থেকে সবার অলক্ষ্যে সমাজে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করেন। দিনাজপুরের খানসামায় এমনই তিন নারী যারা সব ধরনের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে সফল হয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন সমাজে “জয়িতা” নামে।

সফল জননী হিসেবে মোছাঃ কুলছুমা বেগম, অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী স্বপ্না রাণী রায় এবং নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন প্রতষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে মোছাঃ মুক্তারিনা বেগম জয়িতা নির্বাচিত হোন। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মহিমায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এই জয়িতাদের জীবনের গল্প শুরু অনেক দুঃখ কষ্ট ও অভাব অনটনের মধ্যে। প্রতিটি ক্ষণে বেড়ে উঠেছেন সংগ্রাম করে। সংসার, স্বামী, ছেলে, মেয়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে অতি দুঃখ কষ্টে তাদের দিন কাটাতে হয়েছে। জীবন জীবিকার প্রয়োজনে তারা বিভিন্নভাবে ছুঁয়েছেন সফলতার স্তর।

এদের মধ্যে সফল জননী কুলছুমা বেগম উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ইছামতি শাহপাড়া গ্রামের মৃত শুকর আলীর স্ত্রী। অপ্রাপ্ত বয়সে সাধারন কৃষক পরিবারে কুলছুমা বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের ১৪ বছরের মধ্যে তিনি চার পুত্র ও দুই কণ্যা সন্তানের জননী হন। বড় ছেলের বয়স যখন ১৩/১৪ বছর তখন স্বামী মারা যায়। স্বামী মারা যাবার পর যৌথ পরিবারে তার ৭ সদস্যের পরিবারকে বোঝা মনে করে সুপরিকল্পিত ভাবে চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত এক খন্ড আবাদি জমি দিয়ে তাদের পৃথক করে দেয়া হয়। ছোট ছোট ৬ জন ছেলে-মেয়ে নিয়ে পরিবার পরিচালনা করা কুলছুমা বেগম খুব বেকাদায় পড়েন। পরে জীবন-জীবিকা নির্বাহের একমাত্র সামান্য কৃষি জমি, নিজের গহনা বিক্রি করে ও প্রতিবেশির নিকট অর্থ ধার নিয়ে ধানের ভাপাই করে নিজের পায়ে ঢেঁকিতে চাল করে বড় ছেলের সহায়তায় তা বাজারে বিক্রি করে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করেন। সময়ের ব্যবধানে তার সন্তানরাও বড় হতে থাকে। ছেলেবেলা থেকেই সন্তানদের লেখাপড়ায় খুব আগ্রহ থাকায় নিজে অশিক্ষত হওয়া সত্বেও সন্তানদের পড়াশোনার জন্য ধানের ভাপাই ব্যবসার পাশাপাশি হাঁস-মুরগী পালন ও বর্গা পদ্ধতিতে গরু-ছাগল পালন করেন। পরে তাঁর বড় ছেলে শামসুল হক পরিণত বয়সে লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসারের খানিকটা দায়িত্ব নিয়ে ভাই-বোনদের পড়াশোনার অর্থ যোগান দেন। বর্তমানে কুলছুম বেগমের ৪ ছেলের মধ্যে প্রথম ৩ ছেলে শিক্ষকতা করেন ও ছোট ছেলে প্রাইভেট কোম্পানিতে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এবং ২ মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে গৃহিণী ও ছোট মেয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে চাকুরি করেন। তাঁর সংসারে এখন আর কোন কষ্ট নাই। বর্তমানে সন্তানাদি নিয়ে সুখে শান্তিতে জীবন-যাপন করছেন।

অপর একজন অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী জয়িতা স্বপ্না রানী রায়। তিনা পাকেরহাট জেলে পাড়ার ধীরাজ রায়ের স্ত্রী। তার ১০ বছর বয়সে পিতৃ পরিচয়হীন বাবার সমবয়সী ধীরাজ রায়ের সাথে বিবাহ হয়। তার স্বামী মাতৃসূত্রে এক আত্বীয়ের সহায়তায় পাকেরহাটে চায়ের দোকানে শ্রমিকের কাজ করে সংসার পরিচালনা করেন। যদিও তখন তিনি সংসারের কিছুই বুঝতেন না। স্বামীর নিজস্ব কোন বসত বাড়ী না থাকায় স্বামী-স্ত্রী উভয়ে তার বাবার বাড়িতে বসবাস করেন। বিয়ের ৫ বছর পর প্রথম সন্তান জন্ম হলে ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রী বাড়তি বোঝা মনে করে খারাপ আচরন শুরু করেন। তাদের অসহায়ত্ব দেখে একই পাড়ার প্রতিবেশী তাদের আশ্রয় দেন। স্বামীর কাজের পাশাপাশি স্বপ্না রায় কানের দুল বিক্রি করে মাত্র ৬০০ টাকা দিয়ে ঘরের এক পার্শ্বে দোকান করে পাউরুটি, বিস্কুট, চকলেট, পান সুপারি ও সাবান বিক্রি শুরু করেন। তাদের এ কষ্ট দেখে স্বপ্না রায়ের বাবা-মা আড়াই শতাংশ জমি তার নামে লিখে দেন। সময়ের ব্যবধানে তার আরো ২ কন্যা সন্তান হওয়ায় সংসারে অভাব অনটন শুরু হয়। এক সময় তার বাবার পাওয়া জমি বিক্রি করে ব্যবসা শুরু করেন। পরে ব্যবসা লাভ জনক হলে বিভিন্ন ধরনের এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে বর্তমানে জায়গা কিনে পাকার বাড়ি দিয়েছেন। একই সাথে তার সন্তানেরাও পড়াশোনা করতেছেন। তিনি বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে অনেকটাই স্বচ্ছল ও স্বাবলম্বী।

আর একজন হলেন মুক্তারিনা বেগম। সে নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর বাবা পেশায় একজন শিক্ষক আর মা গৃহিণী। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে সে সপ্তম। তার বাবা শিক্ষকতা করলেও সন্তানদের লেখাপড়ায় কোন আগ্রহ দেখান নি। তবে মুক্তারিনা বেগম বাবা-মায়ের বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে টিউশনি করে অর্থ উপার্জন করে এসএসসি পাশ করেন। এর মধ্যে তার বাবা-মা তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য খুব চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু সে চাপ উপেক্ষা করে টিউশনির পাশাপাশি ব্র্যাকের এনএফপি প্রোগ্রামে স্কুল পরিচালনা করে অর্থ উপার্জন করে এইচএসসি পাশ করে বিএসএস অধ্যয়রনত অবস্থায় ব্র্যাক মাইক্রোফিনেন্স চাকুরি করেন। ২০০৮ সালে সেখানে তার সহকর্মী জাহাঙ্গীর আলমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে কর্ম এলাকায় উভয়ে ভাড়া বাসায় অবস্থান করে। এর কিছুদিন পর অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারী জনিত কারনে তার স্বামী চাকুরিচ্যুত হয়ে আত্বগোপন করেন। পরে সেই অর্থ মুক্তারিনা বেগমের কাছে থেকে নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করলে সে অর্থ ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায় তাকেও তার প্রাপ্ত অর্থ ২ লক্ষ ৬৭ হাজার টাকা প্রদান করে চাকুরিচ্যুত করেন। সময়ের ব্যবধানে সে এক পুত্র সন্তানের জননী হলেও স্ত্রী-পুত্রকে তার স্বামী নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তালবাহানা ও গরিমসি করেন ও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করে। এক সময় স্ত্রী ও পুত্রের স্বীকৃতির দাবিতে তার স্বামীর বাড়িতে অনশন করলে তার শ্বশুর-শাশুড়ী পুত্রবধু হিসেবে অস্বীকৃতি জানালেও পরে প্রতিবেশীদের চাপে বাধ্য হয়ে স্বীকৃতি প্রদান করে গৃহ পরিচালিকার ন্যায় ব্যবহার করতেন। চাকুরিচ্যুতির সময়ের প্রাপ্ত অর্থ তার স্বামী ও শাশুড়ি তাকে জমি লিখে দেওয়ার নাম করে সেই অর্থ আত্বসাৎ করে। এর প্রতিবাদ করায় ৩ বছরের সন্তানের মাতৃ ভালবাসা থেকে তাকে বঞ্চিত করে তার স্বামী তাকে ডির্ভোস দেন। পরে সে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিলেও প্রতিবেশী, আত্বীয়-স্বজন ও ভাই-ভাবিদের কটুক্তি ও তিরস্কারে বাধ্য হয়ে কর্মসংস্থানের লক্ষে ঢাকায় যেয়ে প্রাইভেট স্কুলে চাকুরি ও সাংবাদিকতা শুরু করেন। এতে অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বচ্ছলতা ফিরে আসলেও ফেলে আসা অতীতের নির্যাতনের বিভিষীকা, শিশু সন্তানের সাথে স্মৃতি বিজড়িত দিনগুলোর কথা ও তাকে কাছে না পাওয়ার বেদনা সর্বক্ষণ পীড়া দেয়। প্রকিকূলতাকে জয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে যাদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরনা পেয়েছেন তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত জয়িতা অন্বেষনে বাংলাদেশ শীর্ষক কার্যক্রমটি একটি ভালো কার্যক্রম। উপজেলার বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা এই ৩ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতার জীবন কাহিনী পড়ে আমাদের নারী সমাজ উৎসাহিত হবে এবং এভাবেই নারীর ক্ষমতায়ন হবে বলে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোছাঃ ফারজানা ইয়াসমিন জানান।