সড়ক পরিবহন আইন বাতিলের দাবিতে শ্রমিকদের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘট চলছে দেশজুড়ে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। রাজধানী ঢাকাসহ দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।

রবিবার ভোর ছয়টা থেকে শুরু হয়েছে ধর্মঘট। সকালে রাস্তায় নেমে যাত্রীরা বাস না পেয়ে পড়েন ভোগান্তিতে। অফিসগামী যাত্রীরা গণপরিবহন না পেয়ে বিকল্প উপায়ে গন্তব্যে রওয়ানা করেন।

সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে আমাদের প্রতিবেদকেরা জানান, প্রতিটি পয়েন্টে শত শত যাত্রী অপেক্ষা করছে, কিন্তু কোনো গণপরিবহন নেই। বাধ্য হয়ে কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ রিকশা-ভ্যানে করে, আবার কেউ বিকল্প কোনো মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছেন।

মাতুয়াইল থেকে আমাদের সিনিয়র প্রতিবেদক মোসাদ্দেক আহমদ বশির জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে কোনো ধরনের গণপরিবহন চলছে না। তবে প্রাইভেটকার ও কিছু সিএনজি চলতে দেখা গেছে। সকাল থেকে সাইনবোর্ড, শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, মাতুয়াইল মেডিকেল, কাজলা বাস স্ট্যান্ডে শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

মাতুয়াইল মেডিকেল থেকে মতিঝিল যাবেন সাহেরা বেগম। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। কোনো ধরনের গাড়ি নেই। ৯টার মধ্যে অফিসে যাওয়ার কথা। কিন্তু আজ হয়তো অফিসে যাওয়া হবে না।

আমাদের প্রতিবেদক কাজী রফিকুল ইসলাম জানান, ধর্মঘটের কারণে সকাল থেকে বন্ধ রয়েছে মোহাম্মদপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া সব বাস। কয়েকটি বিআরটিসি বাস ছাড়া কোনো গণপরিবহন নেই। তবে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে শ্যামলী রুটে চলাচল করছে লেগুনা।

 

ইজিবাইক ছাড়া সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে গাবতলী থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সড়কে। একইভাবে বসিলা, ঘাটারচর, কেরানীগঞ্জ থেকে ঢাকামুখী গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে বাস না পেয়ে হতাশ শাহরিয়ার। গন্তব্য কাকরাইল। বাধ্য হয়ে নিতে হচ্ছে অটোরিকশা। শাহরিয়ার অভিযোগ করেন, সড়কে অটোরিকশার পরিমাণ কম। কিন্তু ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ।

শাহরিয়ার ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘মানুষ বিপদে পড়েছে, এরাও সুযোগ নিচ্ছে। কিছু বলার নেই। সিএনজি চালকরাও ধর্মঘটকারীদেরই অংশ।’

বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড়ে শ্রমিকরা অবস্থান নিয়ে ইজিবাইক বন্ধ ও সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে তাতে বাধা দেন মোহাম্মদপুর থানা কৃষক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আক্তারারুজ্জামান অভি। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘সহিংস অবস্থান, সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি, জ্বালাও পোড়াও বিএনপি জামায়াতের কাজ। এগুলো পাকিস্তানের রূপ। আমরা শ্রমিক, আমরা সেদিকে যাব না। সাধারণের মানুষের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আমি আমার শ্রমিক ভাইদের সাথে সে বিষয়ে কথা বলেছি, তারা আমার কথা রেখেছে।’

এদিকে শ্রমিকরা শুধু ধর্মঘট ডেকেই ক্ষান্ত হয়নি, অন্য পরিবহনও চলতে দিচ্ছে না। মোটরসাইকেল ও সিএনজি অটোরিকশা থেকে যাত্রী নামিয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মতিঝিলে একটি সরকারি অফিসে চাকরি করেন আহমদ আলী। রবিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় এসে দেখেন কোনো গণপরিবহন নেই। বাধ্য হয়ে তিনি একটি সিএনজিতে উঠেন কয়েকজনের সঙ্গে। কিন্তু কিছুদূর আসার পর সিএনজিটি থামিয়ে দেয় শ্রমিকরা। পরে বাধ্য হয়ে তিনি পায়ে হেঁটেই মতিঝিলে আসেন।

রাস্তায় গণপরিবহন না থাকলে কী ধরনের দুর্ভোগে পড়তে হয় তা টের পাওয়া গেছে গত আগস্টের শুরুতে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনে কার্যত অচল হয়ে পড়ে দেশ।

পরিবহন শ্রমিকরা এবার ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। মঙ্গলবার ভোরে তাদের এই কর্মসূচি শেষ হবে। তবে দাবি আদায় না হলে এরপর অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, এই কর্মসূচি তারা বাধ্য হয়ে নিয়েছেন। এই আইনের বেশ কিছু ধারা শ্রমিক স্বার্থের বিরুদ্ধে করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদরে। এর মাধ্যমে পরিবহন শ্রমিকদের চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের।

শ্রমিকদের আপত্তির কারণ, আইনে সড়ক দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য না করে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে জামিন অযোগ্য করা হয়েছে। আর দুর্ঘটনা যদি ইচ্ছাকৃত হত্যা প্রমাণ হয়, তাহলে বিচার হবে ৩০২ ধারায়, সর্বোচ্চ শাস্তি হবে ফাঁসি।

 

পরিবহন শ্রমিককের কর্মসূচিতে বলা হয়েছে, এমনিতেই প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা রাস্তায় গাড়ি চালান। তার ওপর আবার বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুর ঝুঁকি। এ কারণে শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে পেশা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা শুরু করে দিয়েছেন।

এ অবস্থায় এই আইনের সংশোধন করা ও বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমস্যা নিরসনে আট দফা দাবি জানায় শ্রমিক ফেডারেশন। এর মধ্যে আছে: ১. সড়ক দুর্ঘটনায় সব ধরনের মামলা জামিনযোগ্য করা; ২. শ্রমিকদের অর্থদ- পাঁচ লাখ টাকা করা যাবে না; ৩. সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখতে হবে; ৪. ড্রাইভিং লাইসেন্সে শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি করা; ৫. ওয়াস্কেলে (ওজন স্কেল) জরিমানা কমানো ও শাস্তি বাতিল করা; ৬. সড়কে পুলিশের হয়রানি বন্ধ; ৭. গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের সময় শ্রমিকের নিয়োগপত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সত্যায়িত স্বাক্ষর থাকা; ৮. সব জেলায় শ্রমিকদের ব্যাপকহারে প্রশিক্ষণ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করা এবং লাইসেন্স ইস্যুও ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করা।
ঢাকা টাইমস: